Tuesday, April 9, 2024

বিশ্বশান্তির পেক্ষাপটে; পার্বত্য চট্টগ্রামে সমসাময়িক বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জীবন

 সুচনা ঃ ইতিহাস যে কোন জাতি-গোষ্ঠির অতীত কথা। অতীতের ধারাবাহিক ঘটনা প্রবাহ, ইতিবাচক-নেতিবাচক-ইতিকথা যার ভিত্তি ভূমিতে দাঁড়িয়ে বর্তমানের নির্মাণ। কোন মহান বা নেতা অথবা ব্যক্তির দ্বারা জাতি ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থায় সুনিয়ন্ত্রিত আচার, অনুশীলন প্রবর্তিত করেছিল, ইতিহাস তারই কাহিনীর উজ্জ্বল প্রকাশ। ইতিহাস নিজ সৃষ্টি মহিমায় মহিমাম্বিত এবং অতীতের গৌবরে গৌববান্বিত এক সত্যের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত। ইতিহাস এবং ঐতিহ্য জাতির চলার পথ প্রর্দশক এবং ভবিষ্যতে অতীতের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি জাতির শুভ সঙ্গীরুপে হুঁশীয়ারী সংকেতের ধারক ও বাহক।  যে সকল জ্ঞানী ও গুণীজনেরা জাতির মুক্তি সাধনে আতœত্যাগী, মানব সভ্যতার বিকাশে ও শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসারে আমরণ সংগ্রাম করে গিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য অর্জনের কাহিনী ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌমত্ব গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ একটি দেশ। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় ভাষা নামে স্বীকৃত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপ-ভাষা রয়েছে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ও ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম সংযোগ স্থল হল ‘বাংলাদেশ’। বিশ্বের প্রধান চার ধর্মাবলম্বী বৌদ্ধ, মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টানের বসবাস এই ‘বাংলাদেশে’। বৌদ্ধরা এদেশের আদি অধিবাসী। এই দেশের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিশেষতঃ প্রাচীন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন-বিবর্তনে বৌদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম যুগ যুগ ধরে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে এখনও সেই ধারা অব্যাহত আছে। বৌদ্ধরা মূলতঃ শান্তপ্রিয় জাতি। সম্প্রীতিতে সহাবস্থান তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কালের বিবর্তনে যদিও নানা উত্থান-পতন হয়েছে তাতেও তারা প্রাচীন সংস্কারগত কারণে বিশেষতঃ বুদ্ধ ও তাঁর নৈতিকতাকে অন্তরে ধারণ করে মৈত্রী চেতনা, সাম্যভাব সর্বোপরি অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী। বৌদ্ধ জনগণ এদেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করে আসতেছে। বাংলাদেশের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি চারটি ভাগে বিভাজন করা হয়েছে। এই সকল বৌদ্ধদের মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে আদিবাসী বা পাহাড়ি বৌদ্ধরা সর্বাধিক। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের চট্টগ্রামে, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা সমূহের এদের বসতি, ইদানিং উত্তরবঙ্গের ওরাঁও আদিবাসী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি হিসেবে আতœ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। প্রাচীন বিকৃতি বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করে বুদ্ধের মৌলিক নীতি থেরবাদী ধর্মে দীক্ষিত হয়ে পুনজাগরণের ধারাকে ধারণ করে চলেছে, এটা আরেকটি শুভ লক্ষণ বলা যায়। রাজনৈতিক জটিলতা এবং ভূমি সমস্যা ব্যতীত বুদ্ধের মহান শিক্ষার প্রতি গভীর আনুগত্য, শ্রদ্ধাশীল ও গুরুগত প্রাণ বিধায় অতীতের চেয়ে বর্তমানে অনেক অনেক শান্তিতে অবস্থান করছে নির্ধিধায় বলা যায়। বৌদ্ধরা সংখ্যায় স্বল্প হলেও সমগ্র বাংলাদেশ তথা বিশ্বে বৌদ্ধ ধর্মদর্শন ও সভ্যতার ইতিহাসে যুগান্তকারী মাইল স্টোন সৃষ্টিকারী বৌদ্ধরাই উত্তরাধিকারী।


পার্বত্য চট্টগ্রামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিনটি পার্বত্য জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত। এই তিনটি পার্বত্য জেলার দশ ভাষা-ভাষী ১৩টি জুম্ম বা পাহাড়িদের বসবাস; এগুলি হলো- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো বা মুরং, বম, খুমী, খ্যায়ং, রাখাইন, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই বা কুকি, রিয়াং, উসুই বা পাংখোয়া।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি নয় উপজাতি নামে স্বীকৃত। এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা গুলো নৃ-তাত্ত্বিক বিচারে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠির অর্ন্তভূক্ত।
এ প্রসঙ্গে প্রফেসর বেসইনে পিয়ের বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উপজাতীয় লোকেরা মানব জাতিতত্ত্বের দিক থেকে পূর্ব পাকিস্থানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অন্যান্য স্থায়ী বাসিন্দাদের থেকে আলাদা। এদের সাদৃশ রয়েছে তিব্বত থেকে ইন্দোচীন পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের পাহাড়িয়া লোকদের সঙ্গে। এরা খর্বকায় এদের গায়ের হাড় উন্নত, মাথার চুল কালো, ছোট চোখ সর্বোপরি শারীরিক গঠন ও আকৃতির দিক থেকে এঁরা মঙ্গোলীয় জাতির বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে (পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি, প্রফেসর পিয়ের বেসেইনে অনুবাদ : অধ্যাপিকা সুপিয়া খান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা- ১৯৯৬,পৃ: ২)।   
পার্বত্য চট্টগ্রামের এক একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠির উৎপত্তি, বিকাশ, ভাষা, সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির ইতিহাস অন্য আদিবাসীর জাতিসত্তা থেকে ভিন্ন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক পরিচয়
    অবস্থান : বর্তমানে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম ২১ ডিগ্রী ১৫" হতে ২৩ ডিগ্রী ৪৫" উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১ ডিগ্রী ৫৪" হতে ৯২ ডিগ্রী ্র ৫০" পূর্ব দ্রাঘিমাংশ বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাংশের বিস্তৃত পবর্তমালা জুড়ে অবস্থিত। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান এই তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বা ঈযরঃঃধমড়হম ঐরষষ ঞৎধপঃ’ং নামে পরিচিত।
    আয়তন নিশ্চিতভাবে সম্ভবত কেউ জানে না। এক মতে ৫,০৯৩ বর্গমাইল, আরেক মতে, ৫,১৩৮ বর্গমাইল বা ১,৩০০ বর্গ কি:মি:, মোটামুটি বাংলাদেশের দশ ভাগের একভাগ। ক্যাপ্টেন. টি. এইচ লুইন উল্লেখ করেছেন ৬,৭৯৬ বর্গ মাইল। ১৮৮১ সালের ১ সেপ্টেম্বর “চাকোমাস” রাজ্য (বর্তমান বৃহত্তম পার্বত্য চট্টগ্রাম) তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। যথা- চাক্মা সার্কেল, বোমাং সার্কেল, ও মং সার্কেল। সার্কেল অনুসারে এর আয়তন চাক্মা সার্কেল- ২,৪৯৭ বর্গ মাইল, বোমাং সার্কেল- ১,৯৩৪ বর্গ মাইল, মং সার্কেল- ৭০৪ বর্গ মাইল।
১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে তিনটি জেলায় ভাগ করা হয়। যথা- খাগড়াছড়ি জেলা, মাঝখানে রাঙামাটি জেলা এবং দক্ষিণে বান্দরবান জেলা। খাগড়াছড়ি জেলার আয়তন ২,৬৯৯.৫৬ বর্গকিলোমিটার, রাঙ্গামাটি জেলার আয়তন ৬,১১৬.১৩ বর্গকিলোমিটার, বান্দরবান জেলার আয়তন ৪,৪৭৯.০৩ বর্গকিলোমিটার। এই জেলাকে আবার তিনটি সাবডিভিসনে ভাগ করা হয়েছে। যথা- (১) সদর সাবডিভিসন- রাঙ্গামাটি (চাক্মা সার্কেল), (২) বান্দরবান সাবডিভিসন- বান্দরবান (বোমাং সার্কেল), (৩) রামগড় সাবডিভিসন- রামগড় (মং সার্কেল)।
    ভৌগলিকভাবে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি পাবর্ত্য প্রদেশ ও মায়ানমারের পশ্চিম সীমান্তের সাথে সংযুক্ত। উত্তর ও উত্তর পশ্চিমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে মায়ানমারের আরাকান প্রদেশ, উত্তর ও উত্তর-পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য এবং পশ্চিমে বাংলাদেশের সমতল উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা অবস্থিত।
আনুমানিক ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে চাকমা যুবরাজ বিজয়গিরি তাঁর সেনাপতি রাধামন চাক্মা কর্তৃক রোয়াংছড়ি (বর্তমান রামু) অক্সাদেশ (আরাকান সীমান্ত) খ্যাংদেশ (কাঞ্চননগর) ও কালজর (কুকিরাজ্য) অধিকার করে বিশাল রাজ্য “পাবর্ত্য রাজ্য” (চাকোমাস) প্রতিষ্ঠা করে। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে চাকমা রাজা জনুর রাজত্বের সময় রাজ্যসীমা পূর্বে নাম্রে (বর্তমান নাপ নদী) পশ্চিমে সীতাকুন্ড পাহাড়, দক্ষিণে সমুদ্র ও উত্তরে চাইচাল পর্বত শ্রেণী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
১৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দে চাকমা রাজা শেরমুস্ত খাঁর রাজত্বকালে চট্টগ্রাম জেলাসহ পার্বত্য অঞ্চল তাঁর অধিকারে ছিল। তাঁর রাজ্যসীমা ছিল উত্তরে ফেনী নদী, দক্ষিণে শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী স্থান, পূর্বে লুসাই পাহাড়, পশ্চিমে নিজামপুর রাস্তা অর্থাৎ বর্তমান ট্রাংক রোড। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ কোম্পানির কালেক্টর মিস্টার হেনরী ভোলেষ্টের বিবরণ অনুযায়ী পাবর্ত্য চট্টগ্রাম গেজেটেও পূর্বোক্ত সীমানা পরিদৃষ্ট হয় এবং সীতাকুন্ড পাহাড়ও এর অন্তর্ভূক্ত ছিল।
ক্যাপ্টেন. টি.এইচ লুইন উল্লেখ করেছেন, পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা, দক্ষিণ ও পূর্বে  আরাকান প্রদেশর নীল পর্বতশ্রেণী এবং উত্তরে ফেনী নদী যা অর্ধ ত্রিপুরা রাজ্য থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক করে রেখেছে। উত্তর-পূর্বাংশের সীমান্ত সঠিকভাবে নির্দিষ্ট নয় তবে ঐদিকে স্বীকৃত বৃটিশ প্রভাবাধীন পার্বত্য উপজাতীয় অঞ্চল পর্যন্ত ধরা যায়। মোটামুটিভাবে চট্টগ্রাম জেলার সমভূমিতে প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত ফেনী, কর্ণফুলী, সাংগু, মাতামুহুরী ও তাদের উপনদীসমূহের জলধারা বেষ্টিত ভূ-ভাগ এই জেলার পরিসর।

    ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে লোকসংখ্যা গনণা অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট লোকসংখ্যা ৯,৭৪,৪৪৫ জন, উপজাতি ৬,৬৩,০৭৭ জন আর বাঙালি ৩,১১,৩৬৮ জন। চাক্মা ৩,০৬,৬১৬ জন, মারমা ১,৭৬,২৩০ জন, ত্রিপুরা ১,০২,৪৫৫ জন, মুরং ৩,২,০৯৮ জন, তঞ্চঙ্গ্যা ২,১,১৪০ জন, বোম ৫,৫৮৪ জন, পাংখু ১,৬৬৮ জন, খুমি ১,০৯ ১জন, উসাই ৯৬৬ জন, খিয়াং ১,৩২৯ জন, চাক ৭৯৮ জন, লুসাই ৬৬৯ জন ও রিয়াং ২,৪৩৪ জন।
শতকরা হিসেবে ৩০.৫৭% জন চাকমা, ১৬.৬০% জন মারমা, ৭.৩৯% জন ত্রিপুরা, অন্যান্য ৬.০৬% জন পাহাড়ি আর বাঙ্গালি ৩৯.৩৮% জন। বাংলাদেশের মোট জন সংখ্যার ০.৫% জন বসবাস করে। ১৯৭৯ সালে প্রবলভাবে বেড়ে যায় বাঙালি মুসলমানের সংখ্যা। তারা ঠিকে থাকলে কয়েক দশকে পাহাড় হয়ে উঠবে বাঙালি মুসলমানের। সার্কেল অনুযায়ী চাকমা সার্কেল- ১,৬৩,৫২৩ জন, বোমাং সার্কেল- ১,৩৫,১৩৪ জন, মং সার্কেল- ৮৬,৪২২জন।
খাগড়াছড়ি জেলায় বর্তমানে লোকসংখ্যা ৫,১৮,৪৬৩ জন, তার মধ্যে পুরুষ-২,৭১,১৩১ জন এবং মহিলা- ২,৪৭,৩৩২ জন (২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে)। খাগড়াছড়ি সর্বমোট জনসংখ্যা ৬,১৩,৯১৩ বাঙালি ২,৯৬,৯২৬ পাহাড়ি ৩,১৫,১৬৭, চাকমা ১,৬১,৯৬০ ত্রিপুরা ৮৬,১৯৬ মারমা ৬৭,০১১ অন্যান্য ১৭,৪২১ জন (২০১১ সালের জরিপ মোতাবেক)।   
রাঙামাটি জেলায় মোট লোকসংখ্যা ৬,২০,২১৪ জন, পুরুষ ৩,২৫,৮২৩ জন, মহিলা ২,৯৪,৩৯১ জন (২০১১ সালের জরিপ মোতাবেক)। বান্দরবান জেলার মোট লোকসংখ্যা : ৪,০৪,০৯৩ জন। পুরুষ ২,১১,৬২৮ জন, মহিলা ১,৯২,৪৬৫ জন।
১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে লোকসংখ্যা ছিল মাত্র ১,২৪,৭৬২ জন। চাকমা সার্কেল ৪৮,৭৯২ জন। বোমাং সার্কেল ৪৪,০৭২ জন। মং সার্কেল ৩১,৮৯৮ জন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে জনসংখ্যা গণনায় ৩,৮৫,০৭৯ জন। সেখানে বর্তমানে লোখসংখ্যা ৯,৭৪,৪৪৫ জন।
    ১৩টি আদিবাসী। চাকমা, মারামা, ত্রিপুরা, মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, বৌম, পাংখু, খুমি, উসাই, খিয়াং, ছাক, লুসাই ও রিয়াং। প্রত্যেক আদিবাসীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, নিজেদের মধ্যে তাঁরা নিজেদের ভাষায় কথা বলেন, তবে ভিন্ন জাতির সাথে কথা বলেন বাংলা ও ইংরেজীতে। (সহায়ক গ্রন্থ: ১. চাকমা জাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত), সতীশ চন্দ্র ঘোষ, পৃষ্ঠা-৩৩, ২০১০ইং, ২. পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়ার ও পরিবেশ-পরিস্থিতির মূল্যায়ণ, মেজর জেনারেল (অবঃ) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম বীর প্রতীক, পৃষ্ঠা-১৭-২০, ২০০১ইং,। ৩. চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ও তার অধিবাসীবৃন্দ, ক্যাপ্টেন টি.এইচ. লুইন, পৃষ্ঠা-১-৭, ১৯৯৬ ইং।, ৪. চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত, বিরাজ মোহন দেওয়ান, পৃষ্ঠা-১-ক হতে ৬-চ,  ১৯৬৯ইং।],
5. www.rangamati.gov.bd, 6. www.khagrachhari.gov.bd, 7.www.bandarban.gov.bd৮. শান্তিবাহিনী ও শান্তিচুক্তি, সালাম আজাদ, পৃষ্ঠা-১৪, ১৯৯৯ইং)


    স্বাধীন বাংলদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত সীমায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠী উপজাতিদের অবস্থান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন অপূর্ব তেমনি প্রাকৃতিক সম্পদও প্রচুর। সু-উচ্চ পাহাড়ঘেরা সবুজ দৃশ্য শোভিত এলাকা হিসেবে দেশি-বিদেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বনজ ও ফলজ সম্পদের পর্যাপ্ততা শুধু নয় প্রচুর সম্ভাবনাময় খনিজ সম্পদও রয়েছে বলে ভূ-তত্ত্ববিদ এবং গবেষকদের অভিমত। মেধা ও মনন শক্তির পাশাপাশি তথ্য প্রযুক্তির প্রয়োগে এই মূল্যবান সম্পদ গুলো উত্তোলন করতে পারলে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অবকাঠামোবৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় জাগরণ এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দ্রুততর হবে সন্দেহ নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রচুর খাদ্যদ্রব্য, বৈদ্যুতিক সমস্যা দূরীকরণ, বনজ-ফলজ, পর্যটনকেন্দ্র ও মৎস্য সম্পদের চাহিদার সিংহভাগ পার্বত্য এলাকা থেকে পাওয়া যায়। যা না হলে এদেশের অসংখ্য মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য জোগান দেওয়া কঠিন হত। গাছ-বাঁশ থেকে শুরু করে বনজ-ফলজ দ্রব্যাদির প্রতিনিয়ত পার্বত্য চট্টগ্রমেরই উৎপাদিত সম্পদ। সে তুলনায় পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেক ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত শুধু নয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসহায়ত্ব জীবন যাপন করতে দেখা যায়। সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে একজন নাগরিকের প্রাথমিক অধিকার হলো ‘শিক্ষা’। এ শিক্ষা বা জ্ঞানালো অর্জন ছাড়া কোন জাতি উন্নতি হতে পারে না। সরকারি ও বেসরকারিভাবে শিক্ষার অপ্রতুলতা এই এলাকার বসবাসরত জনগণ পিছিয়ে পড়ার প্রথম কারণ। স্বাধীনতার প্রায় ৪৮ বছর পরেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় শিক্ষার আলো প্রবেশ করেনি বললেও ভুল হবে না। কোনো কোনো এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও হাইস্কুলের কোনো ব্যবস্থা নেই। দু’এক জায়গায় হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হলেও কলেজের নাম গন্ধ নেই। দু’একটা জায়গায় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও যাতায়ত ব্যবস্থার দূরত্ব হিসাব করলে দৈনিক অতদূর পায়ে হেঁটে অথবা মোটর সাইকেলে করে যাতায়াত করে কলেজে লেখাপড়া করার মতো সামর্থ্য ও সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বিশ্বায়নের যুগে সম্প্রতি দু’টো বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিকেল কলেজ, কয়েকটি কারীগরী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা সংখ্যানুপাতে অতি নগণ্য বলতে পারি, অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় আধুনিক শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে পার্বত্য কতটুকু পিছিয়ে আছে বলাই বাহুল্য। যার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক সমস্যা যেমন প্রখর তেমনিভাবে সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চেতনাকে উজ্জীবিত করতে বার বার বাধাগ্রস্থ হচ্ছে বলেই মানবতা, মানবপ্রেম ও মানবকল্যাণ অনেকটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। এ বিষয়ে পরে আলোচনায় আসছি।
    পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য স্মরণাতীতকাল থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং ইতিহাসখ্যাত। ১৯৪৭ খ্রি: তথা দেশ বিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত উপমহাদেশকে ব্রিটিশেরা প্রায় দু’শ বছর যাবত নিজেদের অধীনে উপনিবেশ এলাকা হিসেবে শাসন করেছিলেন। ব্রিটিশদের শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন কার্য সুষ্ঠুভাবে পচিালিত করার জন্য ৩জন রাজা নির্বাচিত করে ৩টি সার্কেলে বিভক্ত করা দেওয়া হয়েছে। সার্কেলগুলোর নাম হলো যথাক্রমে ১। মং সার্কেল, মানিকছড়ি (বর্তমানে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা), ২। বোমাং সার্কেল (বর্তমান বান্দরবান পার্বত্য জেলা) এবং ৩। চাকমা সার্কেল (বর্তমান রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা)। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে রাজাদের যে ক্ষমতা ছিল বর্তমানে চীফদের ঠিক ততটুকু ক্ষমতা আর নেই। তবু চিরাচরিত নিয়ম মোতাবেক রাজ প্রতিনিধিদের কর্তৃক বিভিন্ন দপ্তর পরিচালিত যেমন: ১। কৃষি বিভাগ, ২। ভূমি সম্পদ বিভাগ, ৩। মার্কেটিং বিভাগ, ৪। পশু পালন বিভাগ, ৫। বাজার চৌধুরী ও মৌজা প্রধানের দায়িত্ব পরিচালনা বিভাগ, ৬। সামাজিক বিভাগ, ৭। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বিভাগ, ৮। আপ্যায়ন বিভাগ এবং ৯। রাজ নিরাপত্তা বাহিনী বা পুলিশ বিভাগ ইত্যাদি।

ঐতিহ্যবাহী চাকমা রাজাদের তালিকা : ১। রাজা বিজয়গিরি, ৯৯৫ খ্রি:, ২। রাজা বৈধ্বংগিরি, ১০৭৫ খ্রি:, ৩। বাঙ্গালি সর্দার, ১১১৮-১৯ খ্রি:, ৪। রাজা অরুণযুগ ১৩৩৩ খ্রি:, ৫। রাজা সুর্য্যজিত ১৩৮৩ খ্রি:, ৬। রাজা মানেকগিরি ১৪১৮ খ্রি:, ৭। রাজা কদম থংজা  খ্রি:, ৮। রাজা রদংসা খ্রি:, ৯। রাজা তৈন সুরেশ্বরী খ্রি:, ১০। রাজা জনু ১৫১৬ খ্রি:, ১১। রাজা সাত্তুয়া ১৬৩৮ খ্রি:, ১২। রাজা ধাবানা খ্রি:, ১৩। রাজা ধরম্যা খ্রি:, ১৪। রাজা মোগল্যা খ্রি:, ১৫। রাজা সুভল খাঁ ১৭১২খ্রি:, ১৬। রাজা ফতে খাঁ ১৭১৫ খ্রি:, ১৭। রাজা শের মুস্ত খাঁ ১৭৩৭ খ্রি:, ১৮। রাজা সুর্য্যজিত ১৩৮৩ খ্রি:।
বৃট্রিশ শাসনামলে চাকমা রাজাগণ : ১৯। রাজা শুকদেব রায়, ১৭৫৭ খ্রি:, ২০। রাজা সের দৌলত খাঁ, ১৭৭৬ খ্রি:, ২১। রাজা জানবক্স খাঁ, ১৭৮২খ্রি:, ২২। রাজা টব্বর খাঁ, ১৮০০খ্রি:, ২৩। রাজা জব্বর খাঁ, ১৮০২খ্রি:, ২৪। রাজা ধরম বক্স খাঁ, ১৮১২খ্রি:, ২৫। রাজমহিষী রাণী কালিন্দী, ১৮৪৪খ্রি:, ২৬। রাজা হরিশ্চন্দ্র, ১৮৭৩খ্রি:, ২৭। রাজা ভূবন মোহন রায়, ১৮৯৭খ্রি:, ২৮। রাজা নলিনাক্ষ রায়, ১৯৩৫খ্রি:।
পাকস্থান আমল : ২৯। মেজর রাজা ত্রিদিব রায়, ১৯৫৩খ্রি:, ২০। রাজা দেবাশীয় রায়, ১৯৭৭খ্রি: ( চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত, বিরাজ মোহন, ১৯৬৯ইং, ৬৮-১৫৬ পৃষ্ঠা)।

ঐতিহ্যবাহী মং রাজাদের তালিকা : ১। কংজয় ১৭৯৬ - ১৮২৬ খ্রি:, ২। ক্যজসাইন ১৮২৬ - ১৭৮০ খ্রি:, ৩। নরবধি ১৮৭০ - ১৭৮৯ খ্রি:, ৪। ক্যজপ্রু ১৭৮৯ - ১৮৮৩ খ্রি:, ৫। নিপ্রুসাইন ১৮৮৩ - ১৯৩৬ খ্রি:, ৬। রানী নেং উমা ১৯৩৬ - ১৯৫৩ খ্রি:, ৭। মংপ্রুসাইন ১৯৫৩ - ১৯৫৪ খ্রি:, ৮। মঙচীফ (অস্থায়ী) রানী নিহারদেবী ১৯৮৪ - ১৯৯১  খ্রি:, ৯। মঙচীফ (অস্থায়ী) পাইলাপ্রু চৌধুরী মার্চ ১৯৯১-২০০৯ খ্রি:, ১০। সাচিং প্রু চৌধুরী ২০০৯ ( সম্বোধি, সম্পাদক, ক্য সা চিং ও থিন হান মং, ২ মে ১৯৯১ইং, প্রবন্ধ- পার্বত্য খাগড়াছিিড়র মঙ রাজপরিবার, কং জঅং চৌধুরী লিংকন, ১৫ পৃষ্ঠা)।

ঐতিহ্যবাহী বোমাং সার্কেল রাজাদের নামের তালিকা ও সন তারিখ : ১। তবাং শোয়েথী ১৫৩১ - ১৫৫০ খ্রি:, ২। বরাঙ নঙ ১৫৫০ - ১৫৮১ খ্রি:, ৩। নাইন্দা বরাঙ ১৫৮১ - ১৫৯৯ খ্রি:  বরাঙ এর পুত্র।
চট্টগ্রাম অধিবাসী : ১৬৪১ খ্রি: হতে শুরু : ৪। মং চ প্যাই বোমাং ১৬৪১ - ১৬৩০ খ্রি: নাইন্দা বরাঙ এর পুত্র, ৫। মং গ্রই প্রু বোমাং ১৬৩০ - ১৬৬৫ খ্রি: মং চ প্যাই এর পুত্র,  ৬। হেরী প্রু বোমাং ১৬৬৫ - ১৬৭৮ খ্রি: মং গ্রই প্রু এর পুত্র, ৭। হেরী ঞো বোমাংগ্রী ১৬৮৭ - ১৭২৭ খ্রি: হেরী প্রু এর ভ্রাতাপুত্র।

বান্দরবান এর অধিবাসী : ১৮০৪ - ১৭২৭ খ্রি: হতে শুরু : ব্রিটিশ স্বীকৃতি ১৮২২ খ্রি: ৮। কং হ্লা বোমাংগ্রী ১৭২৭-১৮১১ খ্রি: হেরী ঞো এর পৌত্র, ৯। সাক থাই প্রু বোমাংগ্রী ১৮১১ - ১৮৪০ খ্রি: কং হ্লা প্রু এর পুত্র, ১০। কং হ্লা ঞো বোমাংগ্রী ১৮৪০-১৮৬৬ খ্রি: সাক থাই প্রু এর ভ্রাতুষ্পুত্র, ১১। মং প্রু বোমাংগ্রী ১৮৬৬ - ১৮৭৫ খ্রি: কং হ্লা ঞো জেঠতুত ভাই, ১২। সাক হ্লাই ঞো বোমাংগ্রী ১৮৭৫ - ১৯০১ খ্রি: মং প্রু এর ভ্রাতা,১৩। চা হ্লা প্রু বোমাংগ্রী ১৯০১ - ১৯১৬ খ্রি: সাক হ্লাই ঞোর ভ্রাতুষ্পুত্র, ১৪। মং সা ঞো বোমাংগ্রী ১৯১৬ - ১৯২৩ খ্রি: চা হ্লা প্রু এর জেঠতুত ভাই, ১৫। ক্য জাই প্রু বোমাংগ্রী ১৯২৩ - ১৯৩৩ খ্রি: মং সা ঞোর ভ্রাতুষ্পুত্র, ১৬। ক্য জ সাই বোমাংগ্রী ১৯৩৩-১৯৫৯ খ্রি: ক্য জাই প্রু এর পুত্র,  ১৭। মং শোয়ে প্রু বোমংগ্রী ১৯৫৯- ক্য জ সাই এর ভ্রাতা। ১৮। উচপ্রু, ২০১৮ খ্রি: (সম্বোধি, সম্পাদক, ক্য সা চিং ও থিন হান মং, ১৯৯০ইং, প্রবন্ধ মারমা সমাজ ও সংস্কৃতি, ক্য শৈ প্রু, ৪পৃষ্ঠা)।

    বর্তমান যুগ জ্ঞান প্রধান বৈজ্ঞানিক যুগ। প্রতিটি মানুষের মধ্যে স্বাধীন চিন্তা-চেতনা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে গণতান্ত্রিক অধিকার। রাজা, মহারাজা থেকে শুরু করে সাধারণ নিরীহ মানুষ সবাই তার ন্যায্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হওয়াই সকলের প্রত্যাশা। সমবন্টন, সমভোগ, সমদৃষ্টি এবং পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মধ্যে মানুষের মানবতা, মানবতা প্রেম, মানব কল্যাণ এবং মানব ধর্ম নিহিত। বিশে^র মধ্যে মানুষ একমাত্র প্রাণী যার মধ্যে একদিকে বুদ্ধিদীপ্ত চেতনা, অন্যদিকে বিবেকবোধ ও বিচারশীল গুণাবলীর অধিকারী। মানুষের স্বকীয় গুণ হিসেবে বাস্তবতা, যুক্তিসঙ্গত চিন্তা-ভাবনা, বিজ্ঞান মনস্কতা এবং নীতি আদর্শকে গুরুত্ব দিতে দেখা যায়। সেই আদর্শের মানুষ পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প অটল। প্রতিটি মানুষের কম বেশি এই নৈতিকতাকে জাগাতে পারার মধ্যে মানব জীবনের স্বার্থকতা। রাজা হিসেবে রাজার নৈতিক দায়-দায়িত্ব এবং প্রজা সাধারণ হিসেবে রাজার প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধাশীল হলে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলশীল অনুকুল পরিবেশ স্বাভাবিকভাবে এসে যায়। এক্ষেত্রে রাজার সুখ শান্তির চেয়ে প্রজাদের সুখ শান্তি প্রাধান্য পায় বেশি। তখন সমাজ ও দেশ সমুন্নত হতে বাধ্য। বিশ^ায়নের যুগে এটাই প্রতিটি মানুষের আন্তরিক কাম্য।
    স্বাধীন বাংলাদেশ মানে পরাধীনতার অক্টোপাস থেকে জাতিকে মুক্ত করা। এখন আর মাথা নত নয় উচ্চশিরে সহাবস্থান করা। স্ব-স্ব ন্যায্য অধিকারী স্ব-স্ব দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে নিজেকে এবং দেশকে এগিয়ে যাওয়া। যেখানে স্বজাতি, স্বসংস্কৃতি, স্ব-ধর্ম, স্ব-সাহিত্য ইত্যাদিকে জানিয়ে তোলা। এখানে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বলে কোন ধরনের বিভাজন থাকবে না বরং সমান সুযোগ সুবিধা নিয়ে বসবাস করার অধিকার রাখে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠী একই স্বাধীন দেশের নাগরিক এবং এদশের ভূমিজ সন্তান হলেও বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ অবদানের কথা সর্বজন বিদিত। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য বৈদ্যুতিক চাহিদা, বনজ, ফলজ এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেশের জনগণের চাহিদা পূরণে এতদাঞ্চলের অবদান কোনোভাবে ভুলবার নয় বরং এর বিপরীতে পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষ্যের ভাগ্য উন্নয়নে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়েছে এই দাবী করাটা ভুল। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার স্থানে অশান্তির আগুন দিন দিন বেড়ে চলেছে নিদ্বির্ধায় বলা যায়। অথচ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দ্বারা এই দেশের সর্বাধিক উন্নয়নে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এমন নজির নেই। বরং দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে উন্নয়নের সিংহভাগ পার্বত্য অঞ্চল থেকে যাচ্ছে যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দেশের এত সম্ভাবনাময় এলাকা হওয়া স্বত্ত্বেও সেখানকার জনগণের দৈনন্দিন জীবন জীবিকার ধারা, শিক্ষা, সংস্কৃতি বর্তমান বিশে^র তুলনায় কত পিছিয়ে আছে বাস্তবে অনুসন্ধান তথা পরীক্ষা নিরীক্ষা না করলে সঠিক মন্তব্য করা কঠিন।
    পার্বত্য এলাকা স্বাধীন বাংলাদেশের একটি বিশাল অঞ্চল। তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতার ছোঁয়া রয়েছে। যুগোপযোগী শিক্ষার অপ্রতুলতার দরুন অত্র এলাকা যতটুকু এগিয়ে যাওয়া দরকার ছিল সার্বিক বিবেচনায় অনেকটা দুর্বল শুধু নয় অর্থনৈতিক এবং আধুনিক শিক্ষার অগ্রগতি আশানুরূপ হয়েছে এই দাবী করাটা ভুল। এর প্রধানতম সমস্যা হলো রাজনৈতিক। এই রাজনৈতিক সংকট যদি বিদ্যমান থাকবে তখন শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় জাগরণটা বাধা স্বরূপ হয়েছে সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক সমস্যাকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিজ সমস্যাটি আরও জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে দিন দিন। এই মারাত্মক দুটো সমস্যার আশু সমাধান না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি স্থাপন তো দূরের কথা সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অগ্রযাত্রা সদা সর্বদা বিঘিœত হচ্ছে এবং হবে বলা যায়। বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হলেও রাজনৈতিক এবং ভূমি সমস্যাটা অতি জটিল এবং কঠিনরূপ ধারণ করেছে, যা কখন, কিভাবে এর সমাধানে পৌঁছাবে তা নির্দিষ্ট করে বলাও মুশকিল। অতীতের তুলনায় বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে অনেক দূর এগিয়েছে সন্দেহ নেই। তবে সরকারী জটিলতার গিট খোলা যত সহজ মনে হয় তত সহজ নয়। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা এবং পার্বত্য এলাকার জনপ্রতিনিধি তথা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে পরস্পরের মত বিরুেেদর দরুন উভয়ের মধ্যে সমন্বয়, বোঝাপড়া এবং জনগণের সার্বিক হিতসুখ কামনায় যদি এগিয়ে না আসা  যায় তাহলে সময় সাপেক্ষ শান্তি ফিরে আসতে পারে তা নয় দেশের সার্বিক উন্নয়নে ও তরান্বিত হবে আশা করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ফিরিয়ে আনতে না পারলে ভবিষ্যৎ হিংসা-বিদ্বেষের আগুন দিন দিন কমবে না বরং শতগুণ বাড়বে বৈকি? সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জন্মদাতা পিতা-মাতা হিসেবে নিজেদের ছেলে-মেয়েদের গঠন এবং রক্ষা করার দায় দায়িত্ব সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। নতুবা পারিবারিক অস্তিত্ব ঠিকে থাকবে বলে মনে হয় না। ছেলে-মেয়েদের জীবনে পারিবারিক এবং ধর্মীং নৈতিক শিক্ষা খুবই জরুরী। অনেক সময় পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে পিতা মাতা উচ্চ শিক্ষিত না হলেও স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত হওয়ায় সন্তান সন্ততিদেরকে গঠনে অত্যন্ত কঠোর ও শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনে সচেতনতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। সেই পরিবার অন্য দশের চেয়ে একটু আলাদা এবং আচার আচরণে উন্নত স্বভাবের হয়। তাই শেষ জীবনের সেই পিতা-মাতা সুখী যেমন হয় এবং ছেলে-মেয়েরা পরিবারের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে যাবতীয় করণীয় কর্তব্য সম্পাদনে ও নিষ্ঠাবান হতে দেখা যায়। এখানেই পরিবারের সফলতা। এমন কি ছোটবেলা থেকে সকাল সন্ধ্যা প্রার্থনা, গুরুপূজা, গুরু শিক্ষা এবং পিতা মাতার প্রতিও মান্যতা ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করা। পরিবারের সুখ শান্তির মধ্য দিয়ে সামাজিক সুখ শান্তি অনেক নির্ভর করে। বাল্যকাল থেকে নিজেকে নৈতিক ও ধর্মীয় ভাবাদর্শে জীবন গঠিত না হলে বড় হলেও সেই আদর্শ রক্ষিত হয়। আদর্শ ও ধার্মিক পরিবার থেকে আদর্শ সন্তান তৈরি হয়। নতুবা ুন্দর জীবন বিনষ্ট হতে বাধ্য। বিশে^র উন্নয়ন স্বাধীন দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে বনজ ও ফলজ সম্পদে শুধু নয় খনিজ সম্পদের অন্যতম স্থান হিসেবে বৈজ্ঞানিকদের অভিমত তা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও ভূমিজ সমস্যার জটিলতার দরুন আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির প্রয়োগের সুব্যবস্থা না থাকায় বাধাগ্রস্থ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মেধা ও মনন শক্তিকে কাজে লাগাতে না পারার দরুন অর্থনৈতিক উন্নয়নটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। এতে এলাকার জনগণের অর্থনৈতিক অভাব অনটন লেগেই আছে। শুধু তা নয় দেশের পর্যাপ্ত খনিজ সম্পদের উত্তোলন না হওয়ার ফলে দেশ পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছে নির্দ্বিধায় বলা যায়। এক্ষেত্রে সার্বিক বিবেচনা করে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তির দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
    রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অনুকুল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা আদৌ সম্ভব নয়। এত প্রতিকুলতা থাকা স্বত্ত্বেও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি দেশে বিদেশে সুনাম অর্জন করে চলেছে। খেলা ধুলায়ও এদের ছেলে মেয়েরা তুলনামূলক এগিয়ে। আসলে বলতে পারি নিজের মেধা দিয়ে গান, নাটক নিজেদের চেষ্ঠা প্রচেষ্ঠায় রচনা করা, পরিবেশ করা এবং অন্যকে শিক্ষার সুব্যবস্থা করা। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে যোগ্য উত্তরসূরী তৈরি করা, অঞ্চলে, মহল্লায়, সামাজিক, ধর্মীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল তৈরিতে যোগ্যতা বলে জাতীয়ভাবে পরিচিতি ও মর্যাদা লাভে ধন্য হয়। তখন পরিবেশ অনুকুল ও উন্নয়ত হলেই সুসভ্য নাগরিক হিসেবে খ্যাত হয়। এসব সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার আলোকে উন্নত ও সুন্দর করেন জীবনের অধিকারী হওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ফেলে দেশের স্বার্থে অনেক অবদান রাখতে সক্ষম তা নয় স্বজাতি ও সংস্কৃতির উন্নয়নে ও বিশ্ব পরিমন্ডলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। (চলবে)

 ড. জিনবোধি ভিক্ষু, অধ্যাপক, পালি বিভাগ, চ্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পাহাড়ি মেয়ের দেশান্তরের গল্প - সঞ্জীব দ্রং

অবশেষে পাহাড়ের মেয়েটি চলে গেল দেশান্তরে। আমরা জানি, প্রত্যেক মানুষের জীবনে ভিন্ন ভিন্ন গল্প থাকে। স্বতন্ত্র, হয়তোবা গোপনীয়। এমনকি আপনজনও সব মানুষের সব গল্প পুরোপুরি জানে না। বাইরে থেকে ‘সব জানে’ বলে দাবি করলেও ভেতরে সত্য নয়।
আমরা অনেক সময় পুরো কাহিনি না জেনেই মানুষকে বাছবিচার করি। চলে যাওয়ার কালে পাহাড়ি মেয়েটির সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। ওর বন্ধুদের কাছে শুনেছিলাম, বন্ধুরা তাকে বিদায় জানাতে এই ঢাকা শহরে কয়েকজন জড়ো হয়েছিল।
আমি মেয়েটির খবর জানতাম না। অন্যদের মতো আমি ওর অত ঘনিষ্ঠ ছিলাম না। এই মেয়েটি পার্বত্য চট্টগ্রামের অতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে উঠে এগিয়ে চলেছিল। খুব সম্ভাবনাময়, মেধাবী, প্রাণোচ্ছল, সক্রিয়। অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে মাস্টার্স শেষ করে দেশে ফিরে এসেছিল মেয়েটি। নিশ্চয়ই জন্মভূমি দেশমাতাকে কিছু দিতে। জননীর ঋণ কোনো দিন পুরোটা শোধ হওয়ার নয় জেনেও কিছু করার আকাঙ্ক্ষা ছিল মনে। কোনো এক অনুষ্ঠানে পাহাড়ি ভাষায় ওর গানও শুনেছিলাম। ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হঠাৎ দেখা হতো। পাঁচ–ছয় বছর আগে একবার জেনেভায় জাতিসংঘ অধিবেশনে ও যোগ দিয়েছিল। আমিও ছিলাম। তখন কিছু কথা হয়েছিল।
মেয়েটি দেশান্তরে চলে গেল এই বর্ষায়। রাজা দেবাশীষ রায় আমাকে মেয়েটির কথা বললেন। তিনি বললেন, কী করে থাকবে আর? পরে রাজা বাবুকে আমি বললাম, আমরা যাঁরা সিনিয়র, আমাদেরও হয়তো অনেক ব্যর্থতা আছে। এই তরুণ বন্ধুদের মনের খবর আমরা হয়তো রাখতে পারিনি। ওদের হতাশায় ও কঠিন সময়ে একটু ভালোবেসে হয়তো পাশে দাঁড়াতে পারিনি। ছুটে চলা এই নিষ্ঠুর শহরে একটু অবসরে, শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে প্রাণ খুলে ওদের কথা শুনতে পারিনি। পরে মেয়েটিকে আমি ই-মেইল পত্র লিখেছিলাম। শুভকামনা জানিয়ে বলেছিলাম, তোমার নিকটজন না হলেও খবর পেলে তোমার বিদায়ের অনুষ্ঠানে আমি আসতাম। মেয়েটি অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার চিঠির উত্তর দিয়েছিল। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তার ভাবনা ছিল সে দেশেই থাকবে, কোথাও যাবে না।
পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে খুব কঠিন সময় পার করছিল সে। মেয়েটি লিখেছে, ‘আমার দেশ ছেড়ে চলে আসাটা দুঃখময়। ইট ইজ স্যাড ফর মি।’ আবার বলেছে, ‘জীবনে অবাক বিস্ময়কর মুহূর্ত আসে, জীবন পরিবর্তনশীল। আমি পরিবর্তনকে সেলিব্রেট করতে চাই।’ ওর উত্তরে আমি লিখলাম, তাই হোক, ওখানে পরবাসে জীবন হোক আনন্দময়।
আবার বললাম, ওখানে কখনো যেন তোমার নিজকে নিঃসঙ্গ, একাকী মনে না হয়। তোমার যেন অনেক বন্ধু, নতুন বন্ধু, ভালো বন্ধু জোটে নতুন দেশে। তোমাকে যেন চারপাশ ঘিরে রাখে তোমার বন্ধুরা, সব সময়। মাদার তেরেসা বলতেন, সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য হলো নিঃসঙ্গতা, সঙ্গীহীন মানুষের চেয়ে গরিব ও দুঃখী পৃথিবীতে কেউ নেই।
আজ আমি ভাবি, এখানে, এই পাহাড় দেশে তরুণদের কত অনিশ্চয়তা! গত বছর একটি মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল, পড়াশোনা শেষে আইন পেশায় ঢুকেছিল উচ্চ আদালতে, হঠাৎ চলে গেল জার্মানি। রাজা দেবাশীষ রায় বললেন, ওর নাম নাকি পাহাড়ে কোনো এক হত্যা মামলায় ঢোকানো হয়েছিল। আমি জানি অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে যে পাহাড়ের মেধাবী সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে এসেছিলেন অনেক আশা নিয়ে, তাঁদের অনেকেই আবার ফিরে চলে গেছেন অস্ট্রেলিয়া অথবা অন্য কোনো দেশে।
বহু বছর আগে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শামসুন্নাহার হলের একটি পাহাড়ি মেয়ের কথা লিখেছিলাম ‘কোচপানা রাঙামাটি’ কলামে। পরে জেনেছি, এই মেয়েটিও বিসিএস করে সরকারি চাকরি ছেড়ে চলে গেছে মেলবোর্নে। কী আশায় ওদের খেলাঘর বাঁধতে বলব এখানে বেদনার বালুচরে! কেন, কী করে ওদের বলব, এভাবে যেয়ো না, থাকো?
আজ বুকে বিশাল শূন্যতা অনুভব করি। শূন্যতার করুণ হাহাকার। আমার গ্রামে গেলে দেশের সহজ সরল মানুষদের জীবন দেখি। কত শান্ত ও সহনশীল, নীরব সব মানুষ। একদিকে উন্নয়নের প্রচণ্ড আস্ফালন, অন্যদিকে ব্যাপক বৈষম্যের হাহাকার। হুমায়ুন আজাদের ‘কথা দিয়েছিলাম তোমাকে’ কবিতা আজও মনে পড়ে:
‘কথা দিয়েছিলাম তোমাকে/ রেখে যাব পুষ্ট ধান, মাখনের মতো পলিমাটি, পূর্ণ চাঁদ/ ভাটিয়ালি গান, উড্ডীন উজ্জ্বল মেঘ, দুধের ওলান/ মধুর চাকের মতো গ্রাম/ জলের অনন্ত বেগ, রুই মাছ/ পথপাশে সাদা ফুল, অবনত গান/ আমের হলদে বন/ জলপদ্ম, দোয়েল, মৌমাছি। তোমার জন্য রেখে যাচ্ছি নষ্ট ধানের ভেতরে পুঁজ/ টায়ারের পোড়া গন্ধ, পঙ্কিল তরমুজ/ দুঃস্বপ্ন আক্রান্ত রাত আর আলকাতরার ঘ্রাণ/ পথনারী, বিবস্ত্র ভিখারি। শুকনো নদী, বিষ, আবর্জনা...।’
আমি বহুবার বলেছি, রাষ্ট্র যেন এই ভিন্ন ভিন্ন জাতির মানুষদের পাহাড়ের চোখ দিয়ে শুধু নয়, অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। সম্ভব হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরা যেন সংখ্যালঘুদের যন্ত্রণাকে চোখ আর হৃদয় দিয়ে দেখতে শেখে। হয়তো এমন দিন আসবে যখন এই দেশান্তরে চলে যাওয়া মেয়েরা ফিরে ফিরে আসবে জন্মভূমিতে, পাহাড় দেশে, সব অভিমান ভুলে, সাঁঝের বেলা পাখি নীলিমা ভ্রমণ শেষে যেভাবে নীড়ে ফেরে। একটা রিকনসিলিয়েশন হবে। তখন আমাদের রাষ্ট্র হয়ে উঠবে অনেক বেশি মানবিক ও কল্যাণমুখর রাষ্ট্র।
ভেবে কষ্ট পাই, কেন আমাদের প্রিয়জনেরা এভাবে দেশ ছেড়ে চলে যায়? পাকিস্তান রাষ্ট্রে ভিটাবাড়ি ছেড়ে আমার তিন কাকা মেঘালয়ে দেশান্তরি হয়েছিলেন। আর ফেরেননি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে ভিন্নভাবে হলেও কেন আমাদের স্বজন হারানোর পালা শেষ হয় না।
সঞ্জীব দ্রং: কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী
sanjeebdrong@gmail.com
আপডেট: ৩০ জুলাই ২০১৯, 

বিশ্বশান্তির পেক্ষাপটে; পার্বত্য চট্টগ্রামে সমসাময়িক বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জীবন

 
 পূর্ব প্রকাশের পর
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পারিবারিক ধারা
    এক বা একাধিকম মানুষের একত্রীভূতভাবে মিলিত হয়ে একত্রে বসবাসের মাধ্যমে পরিবার সৃষ্টি হয়। যেখানে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, জন্মদাতা, পিতা-মাতা, দাদু-ঠাকুরমাদের বসবাস ঘটে। পরিবারে সকল সদ্যদের মধ্যে বুঝাপড়া, নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আন্তরিক হলে পরিবার, স্ন্দুর ও সৃশৃঙ্খল হয় এবং সার্বিক উন্নয়নে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে স্ব-স্ব দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে এগিয়ে আসলে পর পর উন্নত ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। আলোকিত পরিবার ছাড়া সমাজ জীবন গঠন করা অসম্ভব। সমাজ বিনির্মাণের প্রথম সোপান হল পরিবার। পরিবার যদি উচ্চ শিক্ষিত উন্নত হয়  সমাজ গঠনে দৃষ্টান্ত স্বরূপ হয়। তাই পিতা-মাতাকে যেমন নৈতিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত এবং ধার্মিক হলে পরিবার সুখী সমৃদ্ধি ও শান্তিময় জীবন যাপনে সক্ষম হয়। এটাই বর্তমান সময়ে বেশি প্রয়োজন। জন্ম দাতা পিতামাতা হিসেবে নিজেদের ছেলেমেয়েদের গঠন এবং রক্ষা করার দায়দায়িত্ব সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। নতুবা পারিবারিক অস্তিত্ব ঠিকে রাথা কঠিন হবে। ছেলেমেয়েদের জীবনে আধুনিক শিক্ষা খুবই জুরুরী। অনেক সময় পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে পিতামাতা উচ্চশিক্ষিত না হলেও শিক্ষানুরাগীতা ও স্বশিক্ষার সুশিক্ষিত হওয়াই সন্তান-সন্তুতি গঠনে অত্যন্ত কঠোর শাসক হিনেবে দায়িত্ব পালনে সচেতনতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। সে পরিবার অন্য পরিবার অন্য দশজনের চেয়ে একটু আলাদা এবং আচার আচরণে উন্নত স¦ভাবের হয়। তাই পরিবার যেমন উন্নত হয় এবং পিতামাতা সুখী যেমন হয় এবং ছেলে মেয়েরা পরিবারের যোগ্য উত্তসুরী হিসেবে যাবতীয় করণীয় কর্তব্য সম্পাদনীয় নিষ্ঠাবান হতে দেখো যায়। এখানেই পরিবারের সফলতা। আরো বেশী সফল হয় যদি দৈনন্দিন জীবন যাত্রাকালীন সময়ে ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করা গুরুপূজা গুরুশিক্ষা এবং জন্মদাতা পিতামাতার প্রতিমান্য ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্ঠি করা যায়। পারিবারিক উন্নতি ও উচ্চ শিক্ষায় মাধ্যমে সুখশান্তি আননয়ন যেমন সহজ হয় তেমনি সামাজিক সুখশান্তি অনেকটা নির্ভর করে। বাল্যকাল থেকে এভাবে জীবন গঠন করার সুযোগ ফেলে বড় হলেও সে আর্দশ রক্ষিত হয়। বেশী ভাগ ক্ষেত্রে জুম চাষ বয়ান শিল্পে আয়ের উপর জীবন জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। গুটি কয়েকজন ব্যবসা বানিজ্যের মাধ্যমে অর্থণেতিক সচ্ছলতা আনয়ন করে থাকেন। আর্দশ ও ধার্মিক পরিবার থেকে আদর্শ সন্তার তৈরী হয়।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ধারা
    উন্নত সাংস্কৃতিক চর্চা মাত্রই উন্নত মানস গঠন করা। মুক্ত সংস্কৃতি ছাড়া নতুন কিছু সৃষ্টি করা যায় না। মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চায় মানুষের মন-মানসিকতা অনেক উন্নত এবং প্রসারিত হয়। মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা গভীর সম্প্রীতি এবং নৈকট্যপূর্ণ হয়ে উঠে। সংস্কৃতি এমন এক সৃষ্টি যা দেশপ্রেম এবং স্বজাতি প্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। যোগ্য উত্তরসূরী তৈরিতে সহায়ক হয়। সভ্যতার ক্রমবিকাশে মুক্ত সংস্কৃতি চর্চার বিফলতা নেই। মুক্ত সংস্কৃতি চর্চা মানে নব নব সৃষ্টি। যা আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে সহায়ক হয়। মান্যতা ও শ্রদ্ধাবোধ জাগায়। সুসভ্য জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিক সম্পদ বাঁশ ও গাছ দ্বারা তারা বাদ্যযন্ত্রগুলো তৈরি করে। বনজ সম্পদগুলো তাদের সংস্কৃতিকে সম্দৃ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়তা করে। একদিকে অর্থনৈতিক উন্নতি এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষা এবং পৃষ্ঠপোষকতা দান করার নতুন নতুন পরিবেশ তৈরি হলে পরস্পরের মধ্যে আন্তরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হয়। গান, নাটক, কৌতুক, কীর্তন, যাত্রা গান, গীতিনাট্য, নাচ ইত্যাদিই সাংস্কৃতির অঙ্গ। এগুলি রচনা করা পরিবেশন করা এবং অন্যকে শিক্ষার সুব্যবস্থা করা। প্রশ্ষিণ কেন্দ্রের মাধ্যমে যোগ্য উত্তরসুরী তৈরী করা। অঞ্চলের, মহল্লায়, সামাজিক অনুষ্ঠানে, ধর্মীয় ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে এবং জাতীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিবেশিত হয়ে থাকে। নিজস্ব মেধা, মননশীল অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাগুণে অনেকে জাতীয়ভাবে পরিচিতি ও মর্যদা লাভেরও ধন্য হয়। তখন পরিবেশ অনুকুল ওউন্নত হলেই সুসভ্য নাগরিক হিসেবে খ্যাত হয়। এই সব সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার আলোকে নন্দিতও বরণ্য জীবনের অধিকারী হওয়া যায়।
    প্রত্যক জাতি সত্ত্বার নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। চাকমা ও মারমাদের বার্ষিক উৎসব মহামুনি মেলা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা বর্ষের শেষে বৈসাবি উৎসব পালন করা। এটি পাহাড়িদের প্রধান সামাজিক উৎসব। কঠিন চীবর দান, বৈশাখী পূর্ণিমা প্রধান ধর্মী উৎসব। পুরুষরা ধুতি ও জামা পরে। তবে বর্তমানে এসব পরতে খুব কমই দেখা যায়। মাথায় পরে খবং নারীরা নিম্নাঙ্গে পরে পিনন বক্ষে খাদি তারা শাড়ী ব্লাউজও পরে। নারীরা উৎকৃষ্ট বুনন শিল্পী। তারা হাতের তৈরী নানা কারুকাজ খচিত বস্ত্র বোনে যার নাম আলাম। বাঁেশর বাঁশি তাদের প্রধান বাদ্য যন্ত্র, যাতে তারা তোলে প্রেমাবেগের কাতরতার সুর। তাদের প্রিয় ও প্রধান মহাকাব্যের বিষয় রাধামোহন ও ধনপতির বিরহ বিধুর প্রেম।
পাবর্ত্য চট্টগ্রামে চাকমা জাতির উৎসব গুলো বৈচিত্রময়। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীও নয়নাভিরাম। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্যপটও বদলে যায়। সেই সঙ্গে মানুষের মনে শিহরণ জেগে উঠে প্রতি বছর কঠিনচীবর দান, শবদাহ, জাতর্কম, রাজপূর্ণাহ, থানমানা ও চৈত্র সংক্রান্তি বা নববর্ষ পালনের আগ্রহে। তারা যুগ যুগ ধরে উক্ত উৎসব প্রতি পালন  করে আসতেছে বংশ পরম্পরা। সেই ধারা আজও প্রচলিত রয়েছে। নি¤েœ সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি আলোচনা করা গেল।
রাজ পুণ্যাহ্ : উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ‘রাজপ্রথা’বিলুপ্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী ‘রাজাগণ’ এখনো সামাজিক প্রধান হিসেবে শাসন কাজ পরিচালনা করছেন। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ১৭৭টি মৌজা নিয়ে ‘চাকমা সার্কেল’ গঠিত। ‘রাজ পুন্যাহ্’ হলো এমন একটি অনুষ্ঠান যেখানে ‘চাকমা রাজা’রাজ দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে বসেন এবং হেডম্যানদের নিকট হতে খাজনা আদায় করেন। পূর্বে এ অনুষ্ঠান প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হত। এ অনুষ্ঠানে রাজার অধীনস্থ হেডম্যান ও কার্বারীগণ খাজনা পরিশোধের পাশাপাশি রাজাকে বিভিন্ন উপটোকন অর্পণ করেন।

বৈসাবি বা বিঝু : পাহাড়ি বৌদ্ধদের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি। চৈত্র মাসের শেষ দিন, বৈশাখ মাসের প্রথম দিন ও দ্বিতীয় দিন  মোট তিন দিন এ উৎসব পালন করা হয়। মূলতঃ তথাগত বুদ্ধের আর্বিভাব, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ এ ত্রিস্মৃতি বিজরিত দিন বৈশাখী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করেই এই বৈসাবি উৎসব পালন করা হয়। যদিও সম্রাট আকবর  বাংলা সাল গণনার প্রবক্তা। কথিত আছে আগেকার দিনে প্রথমে অগ্রহায়ণ মাসকে অগ্র বা প্রথম মাস হিসেবে গণনা করা হত। ভগবান বুদ্ধের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই বৈশাখ মাস অগ্র মাস হিসেবে গণনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে পবিত্র প্রবারণা পূর্ণিমা বিশাল ভাবে বান্দরবানে প্রতিবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে মাননীয় মন্ত্রী বীরবাহাদুর উশৈসিং মহোদয়ের উদ্যোগে মহাসমারোহে উদযাপন করা হয়। এই মহতি অনুষ্ঠানে সরকারী বেসরকারী উর্ধতন কর্মকর্তাসহ হিন্দু, মুসলিম এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের হাজার হাজার লোক সমবেত হয়ে আতিথেয়তা গ্রহন করে থাকে। যা বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে লালন করে থাকে।
এ বৈসাবি উৎসবে হিংসা, বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে বন্ধুতের বন্ধন দৃঢ় হয়। সম্প্রীতির বন্ধন আরো জড়ালো হয়। একে অপরের বাড়ীতে বেড়াতে যায় আনন্দ উল¬াস করে । কিন্তু বর্তমানে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়াই উৎসবটি প্রাণ খুলে উদ্যাপন করতে পরতেছে না। এদিকে সেনাবাহিনীও বাঙ্গালি সেটেলার পাহাড়িদের উপর নিপিড়ন অন্যদিকে জেএসএস ও উইপিডিএফ মধ্যে ভাতৃত্ব ঘাটি সংঘাত । এ সমস্ত কারণে সঠিক ভাবে জীবন ধারণ অসম্ভ হয়ে পড়েছে। উৎসব কিভাবে পালন করবে।
পার্বত্য এলাকায় মারমাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড হলো জলখেলা। যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কাছেও আর্কষণীয় বলা যায়। তাছাড়াও বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং রাজাদের মৃত্যুর পর শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অতি সম্মাণ ও গৌরবের সঙ্গে দৃষ্ঠি নন্দন কারুকার্য খচিত সুউচ্চ আলং তৈরী করে তরুন-তরুণীদের নিজস্ব পোসাকে সুসজ্জিত হয়ে ধর্মীয় নৃত্য পরিবেশনসহ শোভা যাত্রা সহকারে শশ্মান ভূমিতে নিয়ে গিয়ে দাহাকার্য সম্পন্ন করা হয়। এটা আরেকটি বৌদ্ধ সংস্কৃতির বৈশিষ্ঠ্য যা অন্যকোন সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা যায় না।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ধারা
    মানুষ মাত্রই সমাজবদ্ধ জীব। সমাজেই মানুষের প্রকাশ ও ক্রমবিকাশ হয়। সমাজ ছাড়া একীভূত হওয়া অসম্ভব। এক এবং একাধিক সমস্যা তথা পরিবারে মহামিলনে সমাজ হয়। ব্যক্তি পরিবার সমাজ একে অপরের পরিপূরক, সহায়ক, সম্পূরক এবং হরিহর আত্মা। সামাজিকভাবে মহামিলন এবং আনন্দ অপূর্ব। এটা একটি মহাশক্তিও বটে। এই সমাজকে সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সমাজ সুসংগঠিত হয়। তখন যিনি অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আন্তরিকভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয় তখন তিনি নেতৃত্বের আসেন সমীচিন হতে দেখা যায়। নেতৃত্ব স্থানে ক্ষমতার আস্ফালন নয় সামাজিক ন্যায় নীতি প্রতিপালনে সুন্দর পরিসামাজিক ন্যায় নীতি প্রতিপালনে সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা। পরস্পর পরস্পরে মিলে মিশে থাকা, অপপদে বিপদে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া, রোগে শোকে একে অপরকে দেখা শোনা করা, সামাজিক কর্মকান্ডে এগিয়ে আসা, সমাজকে সমুন্নত করার নানা কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সুবুদ্ধি ও সুপরামর্শ দেওয়া। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নানা কার্যক্রমে শুরু করা। ব্যবসা বাণিজ্যে সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা। সমাজ সুসংগঠিত এবং ঐক্যবদ্ধ যে কোনো সমস্যার মোকাবেলা করা সহজ হয়। নৈতিকভাবে সামাজিক দায় দায়িত্বের প্রতি আন্তরিক হওয়া। অগ্রজের প্রতি মান্যতা, শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান প্রদর্শন করা।
    বুদ্ধের শিক্ষার মূলমন্ত্র হলো-বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ এই ত্রিরতেœর শরণ নিতে। এই ত্রিরতেœর মর্মবাণীর মধ্যে নিহিত রয়েছে ঈড়সসঁহরঃু  বা সমাজের ধারণা। অর্থাৎ শুধুমাত্র বুদ্ধ, ধর্ম নয় সংঘ বা সমাজও হবে জীবনের মন্ত্র। আপন হতে বাহির হয়ে সকলের সঙ্গে চলতে হবে পথ, তবেই পৌঁছান  যাগে সেই পরম লক্ষ্যে। বুদ্ধের ধর্মই প্রথম সংঘ বা মঠ বা বিহার স্থাপিত করে সমবেত সাধনার আদর্শ স্থাপন করে। সংঘ বৌদ্ধ শ্রামণদের সমাজ এবং সেই সংঘের ঙৎফবৎ বা শৃঙ্খলা হচ্ছে বুদ্ধ নির্দেশিত জীবন পদ্ধতি। বৌদ্ধ শ্রমণকে সংঘের শরণ নিতে হয় শুধুই মন্ত্র হিসেবে নয় – এই সংঘই তার সাধনায় ক্ষেত্র, সংঘই তার জীবন পথ রচনা করে। সংঘ জীবনের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এখানে সহ সাধক বা অন্যান্য শ্রামণদের সঙ্গে একত্রে বাস করার ফলে পরস্পর প্রতি ¯েœহ, ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্বভাব গড়ে ওঠে বা আত্মকেন্দ্রিকতার সংকীর্ণ পরিম-ল থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে। ফলে ব্যক্তিগত মোক্ষ নয়, সমবেত নির্বাণ লাভ তার আদর্শ হয়ে ওঠে।
    এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংঘ বা শ্রামণদের সমাজের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সমাজের সম্পর্ক কি? সংঘ কি সাধারণ মানুষের সমাজ থেকে একেবারেই স্বতন্ত্রভাবে থাকবে? না, – সাধারণ মানুষ বুদ্ধের সমাজ পরিকল্পনা থেকে বহির্ভূত নয়, – সংঘ এবং সাধারণ মানুষকে নিয়েই গঠিত হবে সমাজ। ত্রিরতেœর ‘বুদ্ধ’ এবং ‘ধম্মের’ কোন প্রত্যক্ষ প্রভাব বা সম্পর্ক সাধারণ মানুষের জীবনে সম্যকরূপে আলোকপাত নাও করতে পারে। কিন্তু সংঘ ও সাধারণ মানুষের সমাজ থাকে পাশাপাশি। স্বভাবতই সংঘ জীবনের উচ্চ আদর্শ ও শৃঙ্খলার প্রভাব সমাজ জীবনের প্রত্যেক স্তরে ছড়িয়ে পড়ে সহজে। সংঘ জীবনে যে শীলের  অনুশীলন হয় তা সাধারণ মানুষের গৃহস্থ জীবনেও বিস্তৃত হতে থাকে। এইভাবে ধীরে ধীরে এক বৃহত্তর বৌদ্ধ সমাজ গড়ে ওঠে এবং শ্রামণ ও গৃহস্থ সকলেই শীল অনুশীলন করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সংঘ এবং গৃহস্থ সমাজ তখন পরস্পরের সহায়ক ও পরিপূরকরূপে কাজ করে। একদিকে সমাজের সাধারণ গৃহস্থরা সংঘের শ্রামণদের জীবন ধারণের ন্যূনতম চাহিদার বস্তু অন্ন দান দিয়ে, আতিথেয়তা প্রদর্শন করে কর্তব্য পালন করে। অন্যদিকে তেমনি সংঘের শ্রামণরাও সেই গৃহস্থ মানুষের জীবনে ধর্ম প্রবর্তকের ভূমিকা গ্রহণ করে, তাদের জীবনে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে, তাদের সৎ পথে পরিচালিত করে। এইভাবে গড়ে ওঠে এক ন্যায় নিষ্ঠ ও সৎ সমাজ ব্যবস্থা, যেখানে বিরাজ করে শুধু শান্তি ও আনন্দ। সেই আনন্দময় সমাজের ভিত্তি হবে মৈত্রী ও  প্রেম-সমস্ত প্রাণী জগতের প্রতি ভালবাসা। এখানে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য উল্লেখ করা যায়, “বিশেষ স্থানে গিয়ে, বিশেষ মন্ত্র পড়ে, বিশেষ অনুষ্ঠান করে মুক্তি লাভ করা যায়, এই বিশ^াসের অরণ্যে যখন মানুষ পথ হারিয়েছিল তখন বুদ্ধদেব এই অত্যন্ত সহজ কথটি আবিষ্কার ও প্রচার করবার জন্য এসেছিলেন যে, স্বার্থ ত্যাগ করে, সর্বভূতে দয়া বিস্তার করে, অন্তর থেকে বাসনাকে ক্ষয় করে ফেললে তবেই মুক্তি হয়, কোন স্থানে গেলে, বা জলে ¯œান করলে, বা অগ্নিতে আহুতি দিলে, বা মন্ত্র উচ্চারণ করলে হয় না। এই কথাটি শুনতে সরল, কিন্তু এই কথাটির জন্য একটি রাজপুত্রকে তার রাজ্যত্যাগ করে বনে বনে, পথে পথে, ফিরতে হয়েছে।’ এ কথা নিশ্চয়ই স্বীকার করতে হয় যে, “বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে জনসাধারণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রবল হয়ে প্রকাশ পেয়েছে; এর মধ্যে শুধু মানুষের নয়, অন্য জীবেরও যথেষ্ট স্থান আছে।’  এভাবে বুদ্ধের ধর্মীয় মুক্ত চিন্তা চেতা নায় তাদের সামাজিক জীবন গঠনে আপ্রাণ চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন বলা যায়। অতীতের তুলনায় বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট অনেকটা উন্নত বলা চলে।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় ধারা
    পরিবার, সমাজ, সংগঠন এবং রাষ্ট্র সবই কিন্তু ব্যক্তি ও পরিবার থেকে গোড়াপত্তন হয়। সংখ্যাধিক্য সমাজ ব্যবস্থার সংগঠন তৈরি হয়। এর পরিব্যাপ্তিতে রাষ্ট্র বা দেশ গঠনের পরিকল্পনার সূত্রপাত। এই সামাজিক ন্যায় নীতি ও আদর্শ থেকে রাষ্ট্রেয় পরিকল্পনার সূত্রটি খুঁজে পাওয়া যায়। এই সামাজিক আদর্শ থেকেই রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার সূত্রটি খুঁজে পাওয়া যায়। রাষ্ট্র এক বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থা। যদি একটি ছোট গ্রাম বা জনপদ বুদ্ধ নির্দেশিত  জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করে শান্তি ও আনন্দের আবাস হয়ে উঠতে পারে তবে তা কোন রাজ্য রাষ্ট্র তথা বৃহত্তর সমাজের ক্ষেত্রেই বা অসম্ভব হবে কেন? যে বুদ্ধ সমগ্র প্রাণী জগতের নির্বাণ কামনা করেন তাঁর পক্ষে তাই একটি সর্ব জাগতিক বা সার্বভৌম রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিকল্পনা অত্যন্ত স্বাভাবিক। ঐতিহাসিকদের মতে, বুদ্ধ-সমকালীন ভারতবর্ষে প্রধানত: দুই ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, – রাজতন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্র। কিন্তু বৌদ্ধধর্মে শাসন ব্যবস্থার প্রকার বা ধরণ অথবা কোন রাষ্ট্রনৈতিক তত্ত্বের কথা আলোচনা করা হয়নি। বুদ্ধ উপলব্ধি করেছিলেন যে কোন দেশের সামাজিক ও নৈতিক পুনর্গঠন করতে হলে সেই রাজ্যে একটি স্থিতিশীল ও সৎ সরকার থাকা প্রয়োজন। তাঁর প্রথম বক্তব্য ছিল এই যে দেশে এমন রাজা বা এমন শাসক থাকবেন যিনি নৈতিক ও আধ্যত্মিক আইন প্রণয়ন করে সমস্ত সমাজে এক সৎ পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রয়াসী হবেন এবং যেখানে শ্রামণগণ ও সাধারণ মানুষ বাধাহীনভাবে ‘ধম্ম’ অনুসরণ করে নির্বাণের পথে অগ্রসর হতে পারবে। ঐতিহাসিক তথ্যে পাওয়া যায় যে বুদ্ধ তাঁর জীবদ্দশায় অনেক রাজ দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বিশেষত: কোশল ও মগধের রাজারা যে শুধু বুদ্ধের পৃষ্ঠপোষক ও সহায়ক ছিলেন তাই নয়, তাঁরা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে নিজেদের জীবনেও শীল পালন করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। রাজা বা শাসক এবং জনসাধারণের মধ্যে যদি কোন মহৎ আদর্শ সম্বন্ধে বিরোধ না থাকে তবে সেই আদর্শ সহজেই সমাজের সর্বস্তর বিস্তৃতি লাভ করতে পারে। এই বিষয়ে Trevor Ling আরও বলেছেন, ‘a really enlightened monarchy, sympathetic to Buddhism might have the further important, positive function of providing those conditions and of helping to creat those attitudes among the people which would facilitate the wide-spread acceptance of Buddhist prescription.” রাজা এবং জনসাধারণের মধ্যে এই পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা ধর্মের প্রচার ও প্রসারের পথ সুগম করে তোলে।
    একবার গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের কাছে উপদেশ দেবার সময় বলেন যে রাজ্যের রাজা যদি অসৎ হন তার মন্ত্রীবর্গ ও অন্যান্য কর্মচারীগণও অসৎ হয়ে ওঠে। মন্ত্রী ও কর্মচারীগণ অসৎ হলে তার প্রভাব সমস্ত সমাজের উপরে পড়ে এবং পুরোহিত ও গৃহস্থ শ্রেণীর ব্যক্তিরাও ক্রমশ অসততার প্রকোপে অন্যায়ের পথে বা শাসক সৎ ন্যায়নিষ্ঠা হন তবে মন্ত্রী বা কর্মচারীগণ অসৎ পথে যাওয়ার সুযোগ পায় না। সমাজের উচ্চ স্তরে যদি সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার আদর্শ বিরাজ করে তবে তার প্রভাব সর্বস্তরে আলোর মত প্রতিফলিত হতে থাকে। কারণ সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা সহজাত প্রবণতা দেখা যায় যে  তারা তাদের নেতা বা প্রধানের সমস্ত আচার আচারণকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এমন কি এও দেখা যায় যে নেতা যদি বাঁকা হয়ে হাঁটেন তবে অন্যান্য অধিবাসীরা সেই চলন ভঙ্গি অনুকরণ করে বাঁকা হয়ে হাঁটতে শুরু করেছে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে,
                অগ্নিহোত্র  মুখ যজ্ঞা সাবিত্রী ছন্দসো মুখম,
                রাজা মুখম মনুস্্ সং নদীনং সাগরো মুখম।
    সুতরাং শাসকবর্গের মধ্যে বা সমাজের উচ্চ স্তরে দুর্নীতি প্রবেশ করলে রোগ জীবাণুর মত তা সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। বুদ্ধ তাই চেয়েছিলেন যে রাজা বা রাষ্ট্রপ্রধানগণ রাজ্যে এমন এক জীবন পদ্ধতির প্রবর্তন করবেন যা সমস্ত অধিবাসীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে উন্নত করে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে কোন সামাজিক বা রাষ্ট্রনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার নৈতিক সংগঠনের উপরে। সুতরাং যদি রাজা বা শাসক স্বয়ং বুদ্ধের নীতি অনুসরণ করেন এবং বুদ্ধ নির্দেশিত ধম্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মের স্বীকৃতি দান করেন, সেখানে এই ধর্মের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে তীব্র বাধা উপস্থিত না হওয়াই স্বাভাবিক। যেখানে বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা দেওয়া হয়নি এমন রাষ্ট্রেও যদি রাজা বা শাসকদল পরধর্মসহিষ্ণু ও সংবেদনশীল হন তবে শ্রমণ ও বৌদ্ধ জনসধারণের পক্ষে আপন ধর্ম আচরণ করা সহজ ও নির্বিঘœ হয়। ধর্ম জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত না হলে সমাজ জীবনে বা গার্হস্থ্য জীবনে তার ভিত্তি দৃঢ় হয় না। সুতরাং জাতীয় জীবনে ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাজা বা শাসকবর্গের সমর্থন ও সহায়তা অবশ্যই দরকার। গৌতম বুদ্ধ যে সমসাময়িক বহু রাজদরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন তার মূল উদ্দেশ্য ছিল এইটি। ভারতবর্ষে হিন্দুধর্মের পুনরুত্থান হওয়ার আগে পর্যন্ত বৌদ্ধধর্ম তাই রাজন্যবর্গ, নগর প্রধান, শ্রেষ্ঠী ও ধনী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপকভাবে প্রসারিত হতে পেরেছিল। বুদ্ধের দেহাবসানের পর মৌর্য স¤্রাট অশোক, কুশান স¤্রাট কনিষ্ক, সাতবাহন রাজবংশের বহু রাজা এবং গুপ্ত সা¤্রাজ্যের স¤্রাটগণ এই বৌদ্ধধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। স¤্রাট হর্ষ বর্ধন ও গুপ্ত স¤্রাটগণ বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ না করলেও এই ধর্মের আদর্শের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মৌর্য স¤্রাট অশোক প্রমুখ নৃপতিবৃন্দের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম ভারতের বাইরে চীন, জাপান, সিংহল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে বিস্তৃত হয়েছিল। চীন পরিব্রাজক হিউ-এন-সাঙের বিবরণে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে ভারতে এবং ভারতের বাইরে বৌদ্ধধর্মের বিস্তার লাভের পিছনে গুপ্ত স¤্রাটদের অপরিসীম অবদানের উল্লেখ রয়েছে। গুপ্ত যুগকে ভারতবর্ষের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় বলা হয়ে থাকে। সেই যুগে এই বৌদ্ধধর্মকে কেন্দ্র করেই ভারতীয় সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার প্রভুত উন্নতি ঘটেছিল। বলা বাহুল্য রাষ্ট্রীয় সমর্থন ও সহায়তা ছিল সেই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। তিন পার্বত্য জেলার তিন রাজন্যবর্গ অনেকটা বুদ্ধের নীতি আর্দশে এলাকার শাসনকার্য নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন।

রাজন্যবর্গের শাসন ব্যবস্থা
    বুদ্ধের সময়কালীন ভারতবর্ষে ক্ষুদ্র ক্ষুদ ষোলটি রাজ্যর উল্লেখ পাওয়া যায়। যা ষোড়শ জনপদ নামে পরিচিত। অধুনা এক একটি জনপদগুলো রাষ্ট্র নামে স্বীকৃতি লাভ করে। রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ে বুদ্ধের বক্তব্য বর্তমান রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। পালি ‘সুত্তপিটক’ অন্তর্গত ‘দীঘ-নিকায়’ গ্রন্থের ‘অগগঞ্্ঞ সুত্তন্ত’ এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা রয়েছে (‘দীঘনিকায়’, ৩য় খ-, সম্পা, ভিক্ষু জগদীশ কাশ্যপ। নালন্দা, পালি পাবলিকেশন বোর্ড, ১৯৫৮, পৃ ৬৩ - ৭৬)। জনগণের প্রয়োজনে রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্র এর জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে এক চরম অরাজকতার পরিবেশ উৎপত্তি হয় প্রথম রাষ্ট্রের। এই ‘সুত্তন্ত’ অনুসারে সেই অরাজক পরিস্থিতির মাঝেই জনগণ তাঁদের মধ্য থেকে একজন সুদর্শন শক্তিমান ও কর্মদক্ষ ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে তাকে বললেন: হে সৌম্য! আসুন এবং কর্মভার গ্রহণ করুন। প্রকৃত দোষী ব্যক্তিকে শান্তি প্রদান করুন এবং রাজ্যসীমা থেকে বহিষ্কার করুন। পরিবর্তে আমরা আপনাকে আমাদের ফসলের একটি অংশ দেবো”। সকল জনগণ কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে মনোনীত বলে তাঁর নাম হলো মহাসম্মত। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই সর্বপ্রথম রাজতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। আধুনিককালে রাষ্ট্রে উৎপত্তি বিষয়ে যে সকল মতবাদ রয়েছে, সেগুলি থেকে বুদ্ধের অভিজ্ঞতা অভিন্ন। পাশ্চাত্য রাষ্ট্র বিজ্ঞানী হক্স, লক, রুশো - এর চিন্তাধারার সঙ্গে বুদ্ধ ভাবনার অনেকটাই সাদৃশ্য রয়েছে। রাষ্ট্র মধ্যে সরকারের প্রাথমিক কর্তব্য হলো আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা। রাজা বা শাসক হলেন প্রথমত: জনগণের ভৃত্য এবং জনগণের সদিচ্ছার উপরেই তাঁর কার্যকাল নির্ভর করে। বস্তুত: রাষ্ট্রচিন্তার পরিধিতে বুদ্ধোপদেশ আধুনিক প্রাসঙ্গিক চিন্তাভাবনার উৎস রূপে প্রতিভাত হয় (দি মহাবোধি ৭৫তম খ-, ডিসেম্বর, ১৯৬৭, সংখ্যা ১২, পৃ ৩৯০-৩৯৩। বড়–য়া, দীপক কুমার। অরিজিন অফ স্টেট ও বুড্ডিস্ট অ্যাপ্রোচ’)।
    জনগণের সুশৃংখলতা, নিরাপত্তা, উন্নয়ন কর্মকান্ড এবং কল্যাণের জন্য বৌদ্ধ রাজন্যবর্ঘের সুশাসন অপরিহার্য। নতুবা পদে পদে এলাকার তথা দেশের শান্তি শৃংখলা বিনস্ত হয়। তখনই প্রজা সাধারণের মধ্যে দন্ড সংঘাত এবং নানা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে। রাজাদের সুশাসন বিষয়ে বুদ্ধোপদেশ দ্বারাই বৌদ্ধ ধর্মের প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক শিক্ষার দিককে আলোচিত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্রীয় সুশাসন বা গুড গর্ভর্নেন্স একটি অধুনা প্রচলিত শব্দ হলেও বৌদ্ধ ধর্মের এর প্রয়োগ দেখা যায়। রাষ্ট্রেসুশাসন বলতে শুভ্র, সুশীল, সৎ ও পরিচ্ছন্ন শাসন ব্যবস্থা যা কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ। সুশাসনের মুল লক্ষ্য হলো সামগ্রীকভাবে আপাত দুঃসাধ্য সর্বোত্তম ক্রমবর্ধমান মানবিক উন্নতি সুনিশ্চিত এবং তা বাস্তবায়িত করা। শাসন বা পরিচালনার এর মূথ্য উদ্দেশ্য নীতি নির্ধারণ ও বাস্তাবায়নে সুপরিকল্পনা গ্রহন করা। কিন্ত সুশাসনের কার্যক্রম হলো সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমুহের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে সে গুলিকে সর্বপ্রকার দুনীতিমুক্ত করে মানবধিকার রক্ষায় দৃষ্ঠান্ত রাখা।
১। অংশ গ্রহন (Participation)  রাষ্ট্রে স্বশাসনের (ক) মুল কাঠামো দাড়িঁয়ে আছে রাষ্ট্রের সকল নরনারীর শাসন ব্যবস্থায় অংশ গ্রহনের উপর: (খ) এই অংশদারিত্ব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগতভাবে রাষ্টব্রবস্থায় সামিল করে (গ) এই নিরপেক্ষ অংশ গ্রহনের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ।ঠানিক ও ব্যক্তিগত বাক স্বাধীনতা এবং সুসংগঠিত সুশীল সমাজ।
২। আইনের শাসন (Rule of law) আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন (ক) নিরপেক্ষ, সৎ, আইন সম্মত বিধি ব্যবস্থা (খ) মানবাধিকার রক্ষায় পূর্ননিরাপত্তা, বিশেষ করে সংখ্যলঘু সম্পদায়ে লোকজনের: গ) স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমের নিরপেক্ষভাবে আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ।
৩। স্বচ্ছতাা (Tranparency) সুশাসন ব্যববস্থায়ও স্বচ্ছতার তিনটি বিষয়ে প্রত দৃষ্টি দেওয়া হয়, যেমন (ক) আইন ওবিধি মোতাবেক কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার রুপায়ন (খ) শাসন ব্যবস্থা সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত লাভ করে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহন ও তার বাস্তাবায়ন, (গ) যেকোন বিষয়ে প্রর্ভতি তথ্য যে কোন নাগরিকের কাছে যেন সহজ লভ্য হয়।
৪। দায়বদ্ধতা (Responsiveness) সুশাসনের ফলে রাষ্ট্রীর সকল প্রতিষ্ঠান এবং নীতি নির্ধারকবৃন্দকে সুনির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে কর্ম রুপায়নের জন্য দায়বদ্ধ থাকা।
৫। ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা ( Consensus Orientational) এর জন্য প্রয়োজন (ক) সমাজের বিভিন্ন মতাবলম্বীদের মধ্যে মধ্যস্থতার দ্বারা এক অবাধ ঐক্যমতের ভিত্তি তে সহমতে উপনীত হওয়া । (খ) ঐক্যমত হয়ে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহন ও তা রুপায়নে আগ্রহী হওয়া।
৬। সমদার্শতা ন্যায় বিচার এবং সর্বব্যাপকতা (Equity and Iclusiveness) সমাজরে মঙ্গল নির্ভর করে (ক) সকল ব্যক্তি যেন অনুভব করে তাদের সমাজে গুরুত্ব রয়েছে এবং তারা যেন সমাজের মুল ¯্রােত থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ না করেন; (খ) সমল শ্রেণীর মানুষের, বিশেষ করে যারা পিছিয়ে আসেন তাদের উন্নতি ও মঙ্গলের সর্বপ্রকার সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা।
৭। কার্যকারিতা এবং দক্ষতা (Effctiveness and Efficiency) সুশাসনের অন্তনির্হিত অর্থ হলো; (ক) প্রাপ্ত সকল প্রকার সম্পদের সুব্যবস্থা করে বিধিব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে সফল প্রদান, (খ) পরিবেশ সুরক্ষার দ্বারা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার।
৮। উত্তর দায়বদ্ধতা (Accountabiity) সুশাসনের প্রাথমিকশর্ত হলো উত্তরদায়বদ্ধতা যার জন্য প্রয়োজন (ক) সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ।ঠান সমূহ এবং সুশীল সমাজ সকল কার্যকান্ডের দায়ভার গ্রহন করা; (খ) সদস্যদের প্রতি সাধারণ প্রতিষ্ঠান গুলি আর্থিক ও বাহ্যিক কর্মের জন্য দায়বদ্ধ থাকা।
    বস্তুত সুশাসনের বাস্তব উদ্দেশ্যই হলো সর্বপ্রকার বিভেদ বৈষম্য যতদুর সম্ভব হ্রাস করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়রে বক্তব্যে মনোযোগী হয়ে বর্তমা ও আগামী  সমাজ ব্যবস্থার উপযোগী সম্যক নীতি নির্ধারণ করা। সংক্ষেপে বলা যায় বুদ্ধের রাষ্ট্র চিন্তা ধারায় জনগণ শাসিত হলে অনেক সমস্যার দ্রুত সমাধান এবং ঐক্যবদ্ধ জীবন যাপনে সহায়ক হবে। 

 ড. জিনবোধি ভিক্ষু, অধ্যাপক, পালি বিভাগ, চ্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

তথাগত কর্তৃক সিংগালোবাদ সূত্রের সেই উপদেশ কিভাবে বর্তমানকালে অতি প্রাসঙ্গিক সে সম্পর্কে আলোচনা

তথাগত কর্তৃক সেই উপদেশ কিভাবে বর্তমানকালে অতি প্রাসঙ্গিক সে সম্পর্কে আলোচনা করাই এই লেখার উদ্দেশ্য। ধার্মিক গৃহীর বর্জিত চার প্রকার কলুষ কর্ম তথাগত বুদ্ধ সিংগালোবাদ সূত্রের প্রারম্ভে বলছেন, যাঁরা আর্যশ্রাবক বা ধার্মিক গৃহী তারা চার প্রকার খারাপ কর্ম করেনা। যথা-

১. প্রাণী হত্যা,

২. চুরি, 

৩. ব্যভিচার ও 

৪. মিথ্যাকথা।

৫. নেশা দ্রব্য পান না করা।

২. চুরি বা চৌর্যবৃত্তি: 

চুরি বা অদত্ত দ্রব্য হরণ বলতে অপরের অদত্ত দ্রব্য গ্রহণ বা কাউকে প্ররোচনা দিয়ে গ্রহণ করানো, সম্মতি দেয়া ও উৎসাহ দেয়া। চুরি, ছিনতাই, লুটতরাজ ইত্যাদি ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে হরহামেশাই ঘটছে। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনেক মানুষ চুরি জাতীয় ঘটনার কারণে পথে বসছে। যাদের অনেক আছে তাদের সম্পদ যদি চুরি হয় তবু তারা তা সামলে নিতে পারে, কিন্তু যারা হতদরিদ্র তাদের ‘হাতের পাঁচ’ যা কিছু আছে তাই যদি চুরি-ডাকাতি বা ছিনতাই হয় তবে তাকে তো পথে বসতেই হয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ হতে বিষয়টি কতই ঘৃণ্য তা একটু অনুধাবন করলেই বোঝা যায়।(এখানে ধনীদের সম্পদ চুরির ক্ষত্রে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে তা কিন্তু নয়, চুরি চুরিই তা ধনীদের হোক আর গরীবদের হোক, কমদামী জিনিস হোক আর বেশদামী জিনিস হোক) চুরির দরুণ লোকনিন্দার মুখোমুখি হতে হয়, সমাজে চোর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, ভাল মানুষ তার সাথে চলাফেরা করে না, যারা চলাফেরা করে তাদের প্রতিও স্বাভাবিক ভাবেই লোকেদের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়, ভাল বন্ধুরা পরিত্যাগ করে, তাকে কেউ বিপদাপদে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দেয় না, মান- সম্মান ধুলায় লুটায়, ঘৃণিত হতে হয়, জেল জরিমানা ইত্যাদি বিবিধ শাস্তি পেতে হয়। দেশ-বিদেশের বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো ও ছোট কোম্পানিরাও ব্যাংক হতে ঋণ নিয়ে ঋণ খেলাপি করছে অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ভাবে এবং প্রদত্ত ঋণের টাকাগুলো সাধারণ মানুষের, যা বিরাট চুরির পর্যায়ে পড়ে। মাঝে মাঝে সরকারও এদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে যা চুরিকে প্রশ্রয় দেয়ার শামিল এবং এ কারণে সরকারের জনপ্রিয়তায়ও ধ্বস নামে। আবার ধনী লোকেরা গরীবদের অর্থ আতœসাৎ করছে, বিভিন্ন শিল্প-পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের প্রাপ্য সঠিক ভাবে না দিয়ে উদ্বৃত্ত মূল্য নিজেরা আতœসাৎ করছে, বিশ্বে বড় বড় বেশ কিছু দেশ অপর অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশের তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন সম্পদ লুণ্ঠন করছে, গরীব-ধনী, বিজ্ঞ-অনভিজ্ঞদের থেকে অনেক সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘুষ নিচ্ছে, বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে গিয়ে অনেক মানুষকে সর্বস্ব বিকিয়ে দিতে হচ্ছে। অনেক আমলাদের ঘুষ না দিলে ফাইল ‘লাল ফিতায়’ আটকা পড়ছে, যত্রতত্র মাৎসান্যায়াবস্থা। বিভিন্ন প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন দুর্নীতির আখড়া, বিশেষতঃ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের মূল স্তম্ভ আদালতের(‘আদালত’ বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ন্যায় বিচারের মূল স্তম্ভ) প্রতিটি ইটও নাকি ঘুষ খায়। বাংলাদেশের আদালত হতে কাস্টম, স্বাস্থ্য সেবা খাত হতে শিক্ষা খাত প্রভৃতি  ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ঘুষের কারণে মানুষ অহরহ দুর্বিষহ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভেঙে যাচ্ছে পরস্পর পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের জোড়া। চুরি হতে নিজেকে বিরত রাখতে পারলে পরসম্পদ যেমন রক্ষিত হবে তেমনি নিজের সম্পদও রক্ষা পাবে। ঘুষের কারণে কোন উপযুক্ত প্রার্থীর চাকরী বন্ধ হবে না, পদোন্নতি বন্ধ হবে না, অযোগ্য লোকরা নিয়োগ পাবার সম্ভাবনা কমে যাবে, দেশে দেশে তেল গ্যাস বা অন্যান্য দ্রব্যের কারণে যুদ্ধাবস্থা কমে যাবে, অর্থনৈতিক বৈষম্য নির্বাসনে বা যাদুঘরে যাবার পথ সৃষ্টি হবে। ধন-ধান্য ও ভোগসম্পদ রক্ষিত হবে, অলব্ধ সম্পদ অর্জন হবে, মানুষ বা প্রাকৃতিক কারণে সম্পদ নষ্ট হবার সম্ভাবনা কমে যাবে, এবং প্রত্যেকেই নিতে পারবে ব্যক্তিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিকভাবে স্ব-নির্ভরতার উদ্যোগ। বিশ্বব্যাপী সৃজন হবে সৌভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যরে বাতাবরণ।

বিশ্বশান্তির পেক্ষাপটে; পার্বত্য চট্টগ্রামে সমসাময়িক বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জীবন

  সুচনা ঃ ইতিহাস যে কোন জাতি-গোষ্ঠির অতীত কথা। অতীতের ধারাবাহিক ঘটনা প্রবাহ, ইতিবাচক-নেতিবাচক-ইতিকথা যার ভিত্তি ভূমিতে দাঁড়িয়ে বর্তমানের নির...